বিদায়বেলায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নানা সাফল্যের কথা তুলে ধরলেও আইন-শৃঙ্খলার অবনতির অভিযোগে কার্যত নীরব থাকলেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মহম্মদ ইউনুস। সোমবার রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, সমুদ্রভিত্তিক উন্নয়ন এবং ‘সেভেন সিস্টার্স’ সহযোগিতার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন।
মঙ্গলবার নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান-এর শপথের আগে দেওয়া ওই ভাষণ ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক মহলে তীব্র আলোচনা তৈরি করেছে।
সমুদ্রই উন্নয়নের চাবিকাঠি?
ইউনুস তাঁর বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশের জন্য সমুদ্র কেবল ভৌগোলিক সীমারেখা নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার প্রধান দরজা। বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক বাণিজ্য, ব্লু ইকোনমি এবং আঞ্চলিক সংযোগ প্রকল্পে জোর দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাত রাজ্য—‘সেভেন সিস্টার্স’, পাশাপাশি নেপাল ও ভুটান-কে নিয়ে বৃহত্তর আঞ্চলিক অর্থনৈতিক জোট গঠনের সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করেন। তাঁর দাবি, এই অঞ্চল দক্ষিণ এশিয়ার এক নতুন অর্থনৈতিক কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
আইন-শৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন
তবে সমালোচকদের মতে, ২০২৪ সালের অগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর হামলা, মব হিংসা, অগ্নিসংযোগ—একাধিক ঘটনার অভিযোগ সামনে আসে।
বিদায় ভাষণে এইসব প্রসঙ্গে সরাসরি মন্তব্য না করায় বিরোধী মহলের একাংশ ইউনুসের ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
জামাতকে ‘পেপটক’
ভাষণে নির্বাচনে জয়ী দলকে শুভেচ্ছা জানালেও, পরাজিত শিবিরকেও অভিনন্দন জানান ইউনুস। নাম না করলেও, তাঁর বক্তব্যকে অনেকেই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোটের উদ্দেশে ‘পেপটক’ হিসেবে দেখছেন।
তিনি বলেন, জয় না পেলেও উল্লেখযোগ্য ভোট পাওয়া মানে জনগণের একাংশের আস্থা অর্জন করা। সেই সমর্থনকে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগানোর আহ্বান জানান তিনি।
নিজের মেয়াদকালের সাফল্য হিসেবে ইউনুস উল্লেখ করেন—
- যৌন হয়রানি প্রতিরোধ অধ্যাদেশ
- পারিবারিক হিংসা প্রতিরোধ অধ্যাদেশ
- নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের সংশোধন
তাঁর দাবি, কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নারীদের সুরক্ষা জোরদার করতে নতুন আইন কার্যকর ভূমিকা নেবে।
অভ্যুত্থান-পরবর্তী অস্থির সময়ে দেশের সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকারও প্রশংসা করেন তিনি।
শপথ ঘিরে কড়া নিরাপত্তা
নতুন প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে ঢাকায় কড়া নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। স্থানীয় সময় বিকেল চারটায় জাতীয় সংসদ ভবন-এর দক্ষিণ প্লাজায় শপথগ্রহণের অনুষ্ঠান হওয়ার কথা।
সাধারণত মন্ত্রিসভার শপথ হয় বঙ্গভবন-এর দরবার হলে। তবে এবার সেই প্রথায় পরিবর্তন এনে সংসদ ভবন প্রাঙ্গণেই আয়োজন করা হচ্ছে অনুষ্ঠান।
রাজনৈতিক বার্তা না কৌশলগত অবস্থান?
বিশ্লেষকদের মতে, বিদায় ভাষণে আঞ্চলিক সহযোগিতা ও সমুদ্র অর্থনীতির উপর জোর দেওয়া এক ধরনের কৌশলগত বার্তা। তবে আইন-শৃঙ্খলা ইস্যুতে নীরবতা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও বাড়াতে পারে।
বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনায় ইউনুসের এই ভাষণ কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটাই এখন দেখার।
