পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়াকে ঘিরে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সোমবার গভীর রাতে অতিরিক্ত (সাপ্লিমেন্টারি) ভোটার তালিকা প্রকাশ করেছে ভারতের নির্বাচন কমিশন। তবে তালিকা প্রকাশ করা হলেও, কত জনের নাম চূড়ান্তভাবে তালিকায় যুক্ত হয়েছে বা বাদ পড়েছে, সেই সংক্রান্ত নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান এখনও প্রকাশ করেনি কমিশন। ফলে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি ও উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
এর আগে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রথম দফার চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হয়েছিল। সেই তালিকায় ৫ লক্ষ ৪৬ হাজার ৫৩ জনের নাম বাদ পড়ে। সব মিলিয়ে ওই দিন পর্যন্ত রাজ্যে মোট ৬৩ লক্ষ ৬৬ হাজার ৯৫২ জনের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ যায়। এই বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়াকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলেও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছিল।
সোমবার প্রকাশিত অতিরিক্ত তালিকাটি বুথভিত্তিক দু’টি পৃথক অংশে ভাগ করা হয়েছে। একটি তালিকায় রয়েছে যাঁদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং অন্য তালিকায় রয়েছে যাঁদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ভোটাররা তাঁদের EPIC নম্বর ব্যবহার করে অনলাইনে সহজেই নিজেদের নাম যাচাই করতে পারবেন। তবে বাস্তবে সেই প্রক্রিয়ায় একাধিক প্রযুক্তিগত সমস্যার অভিযোগ উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রেই তালিকা ডাউনলোড করা যাচ্ছে না, আবার EPIC নম্বর দিয়ে সার্চ করলেও নাম দেখা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন বহু ভোটার।
সুপ্রিম কোর্ট-এর নির্দেশ অনুযায়ী, বিবেচনাধীন ভোটারদের তথ্য বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ধাপে ধাপে নিষ্পত্তি করা হচ্ছে। এই কাজে বর্তমানে ৭০০-র বেশি বিচারবিভাগীয় আধিকারিক নিযুক্ত রয়েছেন। রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজকুমার আগরওয়াল জানিয়েছেন, ইতিমধ্যেই প্রায় ২৯ লক্ষ মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে। তবে চূড়ান্ত তালিকায় কত জনের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এবং কত জন বাদ পড়েছে, সেই চিত্র এখনও স্পষ্ট নয়।
ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগে পশ্চিমবঙ্গে মোট ভোটার সংখ্যা ছিল ৭ কোটি ৬৬ লক্ষেরও বেশি। খসড়া তালিকা প্রকাশের সময় প্রায় ৫৮ লক্ষ ২০ হাজার ৮৯৯ জনের নাম বাদ পড়ে। পরবর্তীতে প্রথম দফার চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর মোট বাদ পড়া নামের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৩ লক্ষ ৬৬ হাজার ৯৫২। এছাড়া প্রায় ১ কোটি ৫২ লক্ষ ভোটারকে শুনানির জন্য চিহ্নিত করা হয়েছিল, যাঁদের মধ্যে বড় অংশের তথ্যগত অসঙ্গতি ধরা পড়ে।
এই পরিস্থিতিতে যাঁদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, তাঁদের জন্য আপিলের সুযোগ রাখা হয়েছে। কলকাতা হাই কোর্ট-এর নির্দেশে রাজ্যের ২৩টি জেলার জন্য মোট ১৯টি ট্রাইবুনাল গঠন করা হয়েছে। এই ট্রাইবুনালগুলিতে ভোটাররা তাঁদের নাম পুনর্বিবেচনার জন্য আবেদন করতে পারবেন।
আপিলের ক্ষেত্রে দু’টি পদ্ধতি রাখা হয়েছে—অনলাইন এবং অফলাইন। অনলাইনে নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট বা ECINet মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে আবেদন করা যাবে। অন্যদিকে, অফলাইনে আবেদন করতে হলে জেলাশাসক (DM), অতিরিক্ত জেলাশাসক (ADM) অথবা মহকুমাশাসক (SDO)-এর দফতরে যোগাযোগ করতে হবে। ইতিমধ্যেই এই ট্রাইবুনালগুলি কাজ শুরু করেছে এবং সমস্ত আপিল নিষ্পত্তি হওয়ার পর এগুলি তুলে দেওয়া হবে।
অতিরিক্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ হলেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের অভাব এবং প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে পরিস্থিতি এখনও অস্পষ্ট রয়ে গেছে। ফলে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। আগামী দিনে কমিশন বিস্তারিত পরিসংখ্যান প্রকাশ করলে পরিস্থিতি আরও পরিষ্কার হবে বলে মনে করা হচ্ছে।



