মহারাষ্ট্রে মুসলিমদের বিশেষ সংরক্ষণে ইতি: ২০১৪ সালের সরকারি প্রস্তাব প্রত্যাহার, বন্ধ শেষ প্রশাসনিক পথ

দশ বছর পুরনো এক সরকারি সিদ্ধান্তে আনুষ্ঠানিকভাবে ইতি টানল মহারাষ্ট্র সরকার। মঙ্গলবার রাজ্য সরকার ২০১৪ সালে জারি করা সেই গভর্নমেন্ট রেজোলিউশন (GR) প্রত্যাহার করেছে, যার মাধ্যমে প্রায় ৫০টি মুসলিম সম্প্রদায়কে ‘স্পেশাল ব্যাকওয়ার্ড ক্যাটাগরি–এ’ (SBC-A) এর আওতায় জাতি ও বৈধতা শংসাপত্র পাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।

এই সিদ্ধান্তের ফলে শিক্ষাক্ষেত্রে মুসলিমদের জন্য ঘোষিত ৫ শতাংশ সংরক্ষণের সঙ্গে যুক্ত শেষ প্রশাসনিক পথও কার্যত বন্ধ হয়ে গেল।

নতুন আদেশে আগের সমস্ত নির্দেশিকা ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া বাতিল করা হয়েছে, যার মধ্যে মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য SBC-A শংসাপত্র দেওয়ার ব্যবস্থাও অন্তর্ভুক্ত। ফলে ২০১৪ সালে ঘোষিত হলেও সম্পূর্ণভাবে কার্যকর না হওয়া সংরক্ষণ নীতির আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটল।


কীভাবে শুরু হয়েছিল মুসলিম সংরক্ষণের দাবি?

মহারাষ্ট্রে মুসলিম সংরক্ষণের প্রশ্নটি প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় ২০০৮ সালে। সে সময় কংগ্রেস-এনসিপি জোট সরকার অবসরপ্রাপ্ত আইএএস আধিকারিক মেহমুদ-উর-রহমানের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করে। লক্ষ্য ছিল রাজ্যের মুসলিমদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার সমীক্ষা।

পাঁচ বছরের সমীক্ষার পর কমিটির রিপোর্টে উঠে আসে উদ্বেগজনক চিত্র—

  • প্রায় ৬০ শতাংশ মুসলিম পরিবার দারিদ্রসীমার নীচে
  • সরকারি চাকরিতে প্রতিনিধিত্ব মাত্র ৪.৪ শতাংশ
  • স্নাতক ডিগ্রিধারীর হার মাত্র ২.২ শতাংশ

কমিটি সুপারিশ করে, শিক্ষা, সরকারি চাকরি ও আবাসনে ৮ শতাংশ সংরক্ষণ দেওয়া হোক।

এর ভিত্তিতে ২০১৪ সালের জুলাই মাসে তৎকালীন কংগ্রেস-এনসিপি সরকার একটি অধ্যাদেশ জারি করে—

  • মারাঠাদের জন্য ১৬ শতাংশ সংরক্ষণ
  • মুসলিমদের জন্য ৫ শতাংশ সংরক্ষণ

তবে এই সংরক্ষণ পুরো মুসলিম সমাজের জন্য ছিল না। প্রায় ৫০টি সামাজিক ও শিক্ষাগতভাবে পিছিয়ে থাকা মুসলিম সম্প্রদায়— যেমন তাঁতি, কসাই, তেলি, মৎস্যজীবী প্রভৃতি পেশাভিত্তিক গোষ্ঠী— SBC-A শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত হয়। সংরক্ষণের সুবিধা পেতে তাদের অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির মতো জাতি ও বৈধতা শংসাপত্র সংগ্রহ করতে হত।


আদালতের হস্তক্ষেপ ও অধ্যাদেশের মেয়াদ শেষ

এই সিদ্ধান্ত বম্বে হাইকোর্টে চ্যালেঞ্জ করা হয়। ১৪ নভেম্বর ২০১৪-র রায়ে আদালত মারাঠা সংরক্ষণ বাতিল করে দেয়, তবে শিক্ষাক্ষেত্রে মুসলিমদের ৫ শতাংশ সংরক্ষণ বহাল রাখে।

কিন্তু নির্ধারিত সাংবিধানিক সময়ের মধ্যে অধ্যাদেশটি স্থায়ী আইনে পরিণত করা হয়নি। ডিসেম্বর ২০১৪-তে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর সেটি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে যায়।

মারাঠা সংরক্ষণ ফিরিয়ে আনতে আইনি লড়াই চললেও মুসলিম সংরক্ষণ রক্ষায় কোনও আইন আনা হয়নি। ফলে শিক্ষাক্ষেত্রে ৫ শতাংশ সংরক্ষণ কার্যত বন্ধ হয়ে যায় এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি নির্দেশিকাগুলিও ধীরে ধীরে অকার্যকর হয়ে পড়ে।

২০২০ সালে মহারাষ্ট্র বিকাশ আঘাড়ি সরকার ক্ষমতায় এলে বিষয়টি আবার আলোচনায় আসে। সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী নওয়াব মালিক শিক্ষাক্ষেত্রে ৫ শতাংশ সংরক্ষণের জন্য আইন আনার কথা বলেছিলেন। তবে অল্পদিনের মধ্যেই তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী উদ্ধব ঠাকরে জানান, এ নিয়ে কোনও সক্রিয় প্রস্তাব বিবেচনাধীন নয়।


নতুন সিদ্ধান্তে কী বদলাল?

সাম্প্রতিক গভর্নমেন্ট রেজোলিউশনে—

  • মুসলিম SBC-A শংসাপত্র সংক্রান্ত সব নির্দেশিকা বাতিল
  • জাতি ও বৈধতা শংসাপত্র দেওয়ার প্রশাসনিক প্রক্রিয়া বন্ধ
  • মুসলিমদের জন্য আলাদা ৫ শতাংশ সংরক্ষণের পথ সম্পূর্ণরূপে রুদ্ধ

অর্থাৎ বর্তমানে মহারাষ্ট্রে মুসলিমদের জন্য আলাদা কোনও বিশেষ সংরক্ষণ চালু নেই।


রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া

সমাজবাদী পার্টির বিধায়ক রঈস শেখ বলেন,
“মুসলিমরা বাস্তবে সংরক্ষণের সুবিধা পাচ্ছিলেন না। তাই এই সিদ্ধান্তের তেমন প্রভাব পড়বে না। তবে রাজনৈতিক বার্তা স্পষ্ট— সরকার মুসলিম সংরক্ষণের ধারণার বিরোধিতা করছে।”

অন্যদিকে সমাজকল্যাণ মন্ত্রী সঞ্জয় শিরসাতের দাবি,
“২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে কংগ্রেস ভোটব্যাঙ্ক রাজনীতির জন্য এই ঘোষণা করেছিল। প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হয়নি। সংরক্ষণ কেবল ঘোষণা করলেই হয় না, আইনসম্মত পদ্ধতি মেনে চলতে হয়।”


তাহলে কি মুসলিমরা সংরক্ষণ পাবেন না?

ধর্মের ভিত্তিতে মুসলিমদের জন্য আলাদা সংরক্ষণ মহারাষ্ট্রে নেই।

তবে যে সব মুসলিম সম্প্রদায় ইতিমধ্যে ওবিসি, ভিজেএনটি বা অন্যান্য স্বীকৃত অনগ্রসর শ্রেণির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত, তারা আগের মতোই সংরক্ষণের সুবিধা পাবেন। এক্ষেত্রে ধর্ম নয়, সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসই মূল ভিত্তি।

সর্বশেষ সিদ্ধান্তে স্পষ্ট— মহারাষ্ট্রে মুসলিম সংরক্ষণ এখন শুধুমাত্র বিদ্যমান অনগ্রসর শ্রেণির কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, আলাদা ধর্মভিত্তিক কোনও কাঠামোর আওতায় নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *