
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) ও ভারতের মধ্যে বহুদিনের আলোচিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি এখন চূড়ান্ত হওয়ার একেবারে কাছাকাছি। দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের মঞ্চ থেকে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন ইঙ্গিত দিয়েছেন, আলোচনা বড়সড় অগ্রগতি পেয়েছে, যদিও শেষ ধাপে কিছু বিষয় এখনও নিষ্পত্তি বাকি।
তিনি জানান, “আরও কিছু কাজ বাকি রয়েছে। তবে আমরা একটি ঐতিহাসিক বাণিজ্য চুক্তির দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি। অনেকেই একে ‘সব চুক্তির জননী’ বলছেন—যার মাধ্যমে প্রায় ২০০ কোটি মানুষের বাজার তৈরি হবে এবং যা বিশ্ব অর্থনীতির প্রায় এক-চতুর্থাংশ জিডিপিকে প্রতিনিধিত্ব করবে।”
কেন এই চুক্তি এত গুরুত্বপূর্ণ
এই প্রস্তাবিত চুক্তির প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল বড় অর্থনীতির সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সংযোগ বর্তমান সময়ে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাকে নতুনভাবে সাজাতে পারে।
EU-এর লক্ষ্য চিনের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে বিশ্বাসযোগ্য অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত করা। অন্যদিকে, ২৭ দেশের এই জোটে আরও গভীর প্রবেশাধিকার পেলে ভারতের রপ্তানি শক্তিশালী হবে এবং উৎপাদন ক্ষেত্রে আরও উন্নত স্তরে পৌঁছনোর পথ প্রশস্ত হবে।
দীর্ঘ আলোচনা, নতুন গতি
ভারত–EU মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা শুরু হয়েছিল ২০০৭ সালে। মাঝখানে প্রায় এক দশক আলোচনা কার্যত থমকে থাকলেও, ২০২২ সালে নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগে ফের গতি আসে। পাশাপাশি গড়ে ওঠা ইন্ডিয়া–EU ট্রেড অ্যান্ড টেকনোলজি কাউন্সিল প্রযুক্তি, ডিজিটাল নীতি ও সরবরাহ ব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সমন্বয় বাড়াতে সাহায্য করেছে। এর ফলে শুল্ক ছাড়াও নিয়ন্ত্রক ও আধুনিক ইস্যুগুলি আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।
কেন এখন চূড়ান্ত করার তাড়া
বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি দুই পক্ষকেই দ্রুত সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ইউরোপ একদেশীয় নির্ভরতা কমাতে চাইছে, আর ভারত নিজেকে নতুন করে গড়ে ওঠা বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে তুলে ধরতে আগ্রহী।
এরই মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য রেকর্ড ছুঁয়েছে—২০২৩ সালে পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১২৪ বিলিয়ন ইউরো, আর পরিষেবা বাণিজ্য (বিশেষত আইটি ও ডিজিটাল পরিষেবা) প্রায় ৬০ বিলিয়ন ইউরো। চুক্তি হলে পরিচ্ছন্ন শক্তি, ওষুধ শিল্প, আধুনিক উৎপাদন ও ডিজিটাল পরিষেবার মতো ক্ষেত্রে বড় সম্ভাবনা তৈরি হবে।
যে বিষয়গুলো এখনও জটিল
ইতিবাচক বার্তার মধ্যেও কিছু বড় বাধা রয়েছে। ইউরোপ চাইছে গাড়ি, ওয়াইন ও মদের মতো পণ্যে আরও শুল্ক ছাড়—যে ক্ষেত্রগুলোতে ভারত দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দিয়ে এসেছে।
অন্যদিকে, ভারত দক্ষ পেশাজীবীদের চলাচলের ক্ষেত্রে আরও সুবিধাজনক ব্যবস্থা চাইছে, যা ইউরোপে ভিসা ও অভিবাসন নীতির কারণে স্পর্শকাতর বিষয়। এছাড়াও পরিবেশগত মানদণ্ড, সরকারি ক্রয়নীতি ও নিয়ন্ত্রক সামঞ্জস্য নিয়ে আলোচনা এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি।
সামনে কী অপেক্ষা করছে
আগামী সপ্তাহে উরসুলা ভন ডার লেয়েনের ভারত সফরকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন কূটনীতিকরা। রাজনৈতিক স্তরে জটিল বিষয়গুলির সমাধান হলে চুক্তির চূড়ান্ত খসড়া তৈরি করা সহজ হবে। মাসের শেষ দিকে প্রস্তাবিত ভারত–EU শীর্ষ বৈঠকে বড় অগ্রগতি বা সম্ভাব্য ব্রেকথ্রুর ইঙ্গিত মিলতে পারে।
চুক্তি হলে কী বদলাবে
এই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে তা সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যতম বড় বাণিজ্যিক সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হবে। একই সঙ্গে ভারত বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় আরও দৃঢ়ভাবে যুক্ত হবে। পণ্য, পরিষেবা ও বিনিয়োগের আদানপ্রদান বাড়বে, বাজারে প্রবেশাধিকার হবে আরও স্থিতিশীল ও স্পষ্ট, আর প্রযুক্তি ও মান নির্ধারণে পারস্পরিক সহযোগিতা নতুন মাত্রা পাবে।
বিশ্ব জিডিপির প্রায় এক-চতুর্থাংশকে প্রতিনিধিত্বকারী এই যৌথ বাজার বিশ্ব বাণিজ্যের মানচিত্রে এক শক্তিশালী প্রভাব ফেলতে চলেছে।
