স্বামী–স্ত্রীর বিচ্ছেদের পর নাবালক সন্তানের দায়িত্ব সাধারণত মায়ের কাছেই থাকে—এই দীর্ঘদিনের সামাজিক ও আইনি ধারণা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করল Delhi High Court। বাংলার এক দম্পতির দুই নাবালক সন্তানের কাস্টডি বাবার হাতে দেওয়ার নিম্ন আদালতের নির্দেশ বহাল রেখে হাইকোর্ট জানিয়ে দিল, “মাতৃত্বকে স্বয়ংক্রিয় অগ্রাধিকার” দেওয়ার সময় শেষ।
কী বলেছে হাইকোর্ট?
বিচারপতি অনিল ক্ষেত্রপাল ও বিচারপতি হরিশ বৈদ্যনাথন শঙ্করের ডিভিশন বেঞ্চ স্পষ্ট করে দেয়, অভিভাবকত্ব নির্ধারণে লিঙ্গভিত্তিক পূর্বধারণা নয়, সন্তানের সর্বোত্তম স্বার্থ (Best Interest of the Child)–ই হবে চূড়ান্ত মানদণ্ড।
আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী—
- মায়ের অগ্রাধিকারের ধারণা পুরোনো সামাজিক কাঠামোর ফল।
- বর্তমান সমাজ-বাস্তবতায় বাবা ও মা—উভয়েই সমানভাবে সন্তানের যত্ন নিতে সক্ষম।
- কাস্টডি নির্ধারণে আদালতের একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত সন্তানের মানসিক, শিক্ষাগত ও সামাজিক সুরক্ষা।
নিম্ন আদালতের রায় কেন বহাল?
দিল্লির Patiala House Court দুই নাবালক সন্তানের দায়িত্ব বাবার হাতে তুলে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। মা সেই নির্দেশ চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে আবেদন করেন।
হাইকোর্ট জানায়, নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করার কোনও যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। বরং প্রমাণ ও নথিপত্র থেকে উঠে এসেছে—
- মা সন্তানদের বাবার বিরুদ্ধে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছেন (Parental Alienation)।
- দাম্পত্য কলহের প্রভাব শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যে পড়ছিল।
- বাবার কাছে থাকলে দুই ভাইবোন একসঙ্গে স্থিতিশীল পরিবেশ পাবে।
তবে আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, মা সন্তানের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও যোগাযোগের অধিকার (Visitation Rights) বজায় রাখবেন।
মামলার পটভূমি বিস্তারিত
- ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে দম্পতির বিয়ে।
- ২০১৩ সালে পুত্রসন্তান ও ২০১৯ সালে কন্যাসন্তানের জন্ম।
- ২০১৮ সাল পর্যন্ত একসঙ্গে সংসার।
- স্বামীর অভিযোগ, ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে স্ত্রী কর্মস্থলে যাওয়ার কথা বলে শিলিগুড়িতে বাপের বাড়ি চলে যান।
- প্রথমে ছেলেকে বাবার কাছেই রেখে গিয়েছিলেন।
- এক সপ্তাহ পর আত্মীয়দের নিয়ে এসে ছেলেকে নিয়ে যান।
এরপর স্ত্রী স্বামীর বিরুদ্ধে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করেন। ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪৯৮এ ধারার অপব্যবহারের প্রসঙ্গও উঠে আসে। স্বামী কলকাতা হাইকোর্ট থেকে আগাম জামিন পান।
পরে স্ত্রী দিল্লিতে চাকরি নেন এবং মামলাটি স্থানান্তরের আবেদন করেন। Supreme Court of India মামলাটি দিল্লিতে স্থানান্তরের নির্দেশ দেয়। বিচ্ছেদ মামলা ও কাস্টডি মামলা একসঙ্গেই চলছিল। শেষপর্যন্ত পাতিয়ালা হাউস কোর্ট বাবার পক্ষে রায় দিলে তা চ্যালেঞ্জ করা হয় হাইকোর্টে।
‘পেরেন্টাল এলিয়েনেশন’ নিয়ে আদালতের অবস্থান
হাইকোর্ট জানায়, যদি নিম্ন আদালতের রায় বাতিল করা হত, তাহলে তা ‘পেরেন্টাল এলিয়েনেশন’-এর মতো প্রবণতাকে উৎসাহিত করত।
আদালতের মতে—
সন্তানের মনে অন্য অভিভাবকের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ সৃষ্টি করা তাদের সুস্থ মানসিক বিকাশে বড় বাধা।
দুই ভাইবোনের পারস্পরিক মানসিক নির্ভরতা ও ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করেই বাবার হাতে কাস্টডি দেওয়ার সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়েছে।
কেন এই রায় গুরুত্বপূর্ণ?
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রায় ভবিষ্যতের কাস্টডি মামলাগুলিতে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে। কারণ—
- এটি লিঙ্গনির্ভর অভিভাবকত্বের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছে।
- আদালত স্পষ্ট করেছে, “মা বলেই অগ্রাধিকার” নয়—যোগ্যতা ও সন্তানের কল্যাণই আসল মানদণ্ড।
- পারিবারিক আইনে সমতা ও বাস্তবতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্তের নতুন দিশা দেখাল এই পর্যবেক্ষণ।
সামগ্রিকভাবে, এই রায় পরিবার আইন ও কাস্টডি সংক্রান্ত বিচারব্যবস্থায় একটি তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে।
