বিষ্ণুপুর জেলা হাসপাতালে বিরল অস্ত্রোপচার, সম্পূর্ণ বিনামূল্যে হিপ জয়েন্ট প্রতিস্থাপন—নতুন জীবন পেলেন রোগী

বিষ্ণুপুর, বাঁকুড়া: সরকারি হাসপাতালেও উন্নত চিকিৎসা সম্ভব—এই বার্তাই আবারও সামনে এল বিষ্ণুপুর জেলা হাসপাতাল থেকে। হাসপাতালের ইতিহাসে প্রথমবার সফলভাবে সম্পন্ন হল টোটাল হিপ জয়েন্ট রিপ্লেসমেন্ট (Total Hip Joint Replacement)। প্রায় পাঁচ ঘণ্টার জটিল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে নতুন জীবন ফিরে পেলেন এক রোগী।

জানা গেছে, বাঁকুড়া জেলার জয়পুর থানার গেলিয়া গ্রামের বাসিন্দা বুলটি দিগর (৩৮) দীর্ঘদিন ধরে কোমরের তীব্র সমস্যায় ভুগছিলেন। ছোটবেলার একটি দুর্ঘটনার পর থেকেই ধীরে ধীরে তাঁর কোমরের ব্যথা বাড়তে থাকে। বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা করালেও স্থায়ী সমাধান মেলেনি। সম্প্রতি ব্যথা এতটাই বেড়ে যায় যে তাঁর হাঁটাচলা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।

পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন বড় চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করলে জানানো হয়, সমস্যার সমাধান করতে গেলে হিপ জয়েন্ট প্রতিস্থাপনের অপারেশন করতে হবে। যার খরচ প্রায় ৪ থেকে ৫ লক্ষ টাকা। দিন আনি দিন খাওয়া পরিবারের পক্ষে এত বড় অঙ্কের টাকা জোগাড় করা সম্ভব ছিল না। ফলে কার্যত নিরাশ হয়ে পড়েন তাঁরা।

এই পরিস্থিতিতে প্রতিবন্ধী ভাতা পাওয়ার আশায় একটি হ্যান্ডিক্যাপ সার্টিফিকেট করানোর জন্য প্রায় এক মাস আগে বুলটি দিগরকে নিয়ে বিষ্ণুপুর জেলা হাসপাতালে আসেন পরিবারের সদস্যরা। তখনই বিষয়টি নজরে আসে হাসপাতালের অর্থোপেডিক সার্জন ডা. সমীর জানা-র।

রোগীকে পরীক্ষা করে তিনি জানান, বুলটি দিগর AVN (Avascular Necrosis of Femoral Head) নামক জটিল সমস্যায় ভুগছেন এবং অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার চিকিৎসা সম্ভব। এরপর বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসক দল সিদ্ধান্ত নেয় যে অপারেশন করা হবে।

এই ধরনের অস্ত্রোপচারের জন্য প্রয়োজন অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি। হাসপাতালের সুপার ও চিকিৎসকদের উদ্যোগে একটি মেডিকেল টিম গঠন করা হয় এবং স্বাস্থ্য দপ্তরের সহযোগিতায় প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আনা হয় হাসপাতালে।

রবিবার প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ধরে চলে এই জটিল অস্ত্রোপচার। শেষ পর্যন্ত সফলভাবে সম্পন্ন হয় অপারেশন। চিকিৎসকদের কথায়, অপারেশনের পরের দিনই রোগী নিজে থেকে বিছানায় উঠে বসতে সক্ষম হন এবং তাঁকে হাঁটানোর প্রক্রিয়াও শুরু করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে রয়েছেন।

চিকিৎসকদের মতে, ধীরে ধীরে তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন।

এই ঘটনার পর রোগীর পরিবার অত্যন্ত খুশি। তাঁদের কথায়, যাঁদের কাছে চিকিৎসার খরচ জোগাড় করা অসম্ভব ছিল, সেই পরিবারের সদস্যের জীবন ফিরিয়ে দিয়েছেন সরকারি হাসপাতালের ডাক্তাররা। তাঁদের কাছে চিকিৎসকরাই এখন ভগবানের সমান।

চিকিৎসকদের দাবি, আধুনিক চিকিৎসা পরিষেবায় এখন সরকারি হাসপাতালও অনেক উন্নত। তাই সাধারণ মানুষকে নির্দ্বিধায় সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করানোর জন্য এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *