উজ্জ্বল বন্দ্যোপাধ্যায়, ভাঙড় : হাত নেই, পা দিয়েই উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিচ্ছে ভাঙড়ের সাহনাজ মোল্লা। প্রবল ইচ্ছাশক্তি থাকলে সহজে যে কোনও প্রতিবন্ধকতাকে দূর করা যায় তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ ভাঙড়ের এই উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী। ১৭ বছরের সাহনাজের জন্ম থেকে ডান হাত নেই। দুটো পা বাকা, পায়ের পাতা আঙুল সবই অস্বাভাবিক। উঠতে, বসতে, চলতে, ফিরতে সবকিছুতেই কষ্ট সাহনাজের। প্রবল শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্বেও অদম্য জেদ আর পড়াশোনার তীব্র ইচ্ছা নিয়েই এবারে উচ্চ মাধ্যমিকে বসেছে সাহনাজ। ভাঙড়ের এই বিস্ময় বালিকা শুধু পরীক্ষা নয় পা দিয়ে ভাল ছবিও আঁকতে পারে। এই বিস্ময় বালিকা জানান, হাঁটাচলা করলেই শ্বাসকষ্ট হয়। বেশিক্ষণ পড়াশোনা করতে পারি না। তবুও চাই পরীক্ষায় ভাল ফল করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে, যদি বাবা-মায়ের কষ্ট কিছুটা লাঘব করতে পারি।
দক্ষিণ ২৪ পরগণার ভাঙড় ২ নং ব্লকের আলাকুইলিয়া গ্রামের বাসিন্দা কুতুবুদ্দিন মোল্লা ও বিলকিস বেগমের তিন সন্তানের মধ্যে বড় সাহানাজ। বর্তমানে ভাঙড়ের কারবালা হাই স্কুলের একাদশ শ্রেণির ছাত্রী। গত বছর কারবালা গার্লস হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় ২৬১ নম্বর পেয়ে উত্তীর্ণ হয় সে। মাধ্যমিকের সময় তার পক্স থাকায় রাইটার নিয়ে পরীক্ষা দেয় সে। ছোটবেলা থেকেই মা বিলকিস বেগম সাহনাজের অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়ায়। মা তাঁকে শেখায় কিভাবে পা দিয়ে লিখতে হয়। এখন পা দিয়েই খাতায় অক্ষর ফুটিয়ে তোলে, এমনকি নিখুঁতভাবে ছবি আঁকতেও পারে। অবসর সময়ে সেই ছবি এঁকে রিল বানিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে। তার আশা, সামাজিম মাধ্যম থেকে যদি কিছু টাকা আয় হয় তা দিয়ে নিজের পড়াশোনার খরচ কিছুটা জোগাড় করবে সে।
বৃহস্পতিবার থেকে প্রতিটি উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলে বোর্ডের একাদশ শ্রেণির দ্বিতীয় সেমিস্টার পরীক্ষা শুরু হয়েছে। কারবালা হাই স্কুলে পরীক্ষার হলে পা দিয়ে সাবলীলভাবে লিখতে দেখে সহপাঠী থেকে শিক্ষকশিক্ষিকারা অনেকেই বিস্মিত। অনেকের কাছেই সে এখন অনুপ্রেরণার প্রতীক। সাহনাজের বাবা কুতুবুদ্দিন মোল্লা স্থানীয় একটি ব্যাগ কারখানায় শ্রমিকের কাজ করেন। সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরানোর অবস্থা। মেয়ের চিকিৎসা ও পড়াশোনার খরচ সামলাতে গিয়ে চরম আর্থিক চাপে পড়েছেন তিনি। তিনি বলেন, জন্ম থেকেই মেয়ের নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছে। চিকিৎসা করেও কোন উপকার হয়নি। মা বিলকিস বেগম বলেন, ছোট থেকেই ওর পড়াশোনার প্রতি ভীষণ ধরনের আগ্রহ। ওর ইচ্ছাশক্তি দেখেই পা দিয়ে লেখা শেখানোর চেষ্টা করি। ধীরে ধীরে ও রপ্ত করে ফেলে। এখন একটাই চাওয়া, ও যেন পড়াশোনা চালিয়ে কিছু একটা করে উঠতে পারে। কারবালা হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক আবু তোহা মণ্ডল বলেন, সাহানাজ আমাদের স্কুলের গর্ব। ওর দৃঢ় মানসিকতা এবং অধ্যবসায় সত্যিই প্রশংসনীয়।
পা দিয়েই উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিচ্ছে ভাঙড়ের সাহনাজ
